Monday, June 20, 2011

সঠিক শাহাদা

নবী ইব্রাহিম না ছিলেন ইহুদী , না ছিলেন খৃষ্টান। উনি এমনই আদর্শবান মুসলমান ছিলেন যে , আল্লাহ , রসূল মুহম্মদকে আদেশ করেছেন ইব্রাহিম নবীকে অনুসরন করার জন্য। "অতঃপর আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছি যে, ইব্রাহীমের দ্বীন অনুসরণ করুন, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং শির্ককারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।১৬:১২৩"

আমাদের রসূল ও তার অনুসারীগন সেটাই করেছেন আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পনের মাধ্যমে।
"যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয় তবে বলে দাও, "আমি এবং আমার অনুসরণকারীগণ আল্লাহর প্রতি আত্নসমর্পণ করেছি।" আর আহলে কিতাবদের এবং নিরক্ষরদের(যাদের কাছে আগে কোন কিতাব নাযিল হয় নি) বলে দাও যে, তোমরাও কি আত্নসমর্পণ করেছ? তখন যদি তারা আত্নসমর্পণ করে, তবে সরল পথ প্রাপ্ত হলো, আর যদি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তাহলে তোমার দায়িত্ব হলো শুধু পৌছে দেয়া। আর আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে সকল বান্দা।৩:২০"

তাহলে কেনো আজ লক্ষ লক্ষ মুসলমান হাদীস সাহিত্যের এক বিতর্কিত চরিত্র আবু হুরায়রাকে অনুসরনের ফাঁদে আটকে গেছে?  কোরানের শিক্ষাকে অস্বীকার করেও তারা কি ভাবছে তারা সঠিক পথে আছে? আল্লাহ বলেছেন:
"আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে-আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আহবান করা হয়েছিল যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তা এজন্য যে, তারা বলে থাকে যে, দোযখের আগুন আমাদের স্পর্শ করবে না; তবে সামান্য হাতে গোনা কয়েকদিনের জন্য স্পর্শ করতে পারে। নিজেদের উদ্ভাবিত ভিত্তিহীন কথায় তারা ধোকা খেয়েছে।৩:২৩-২৪"
দেখুন আজকের মুসলমানেরাও একি কথা বলে থাকে যে , দোযখের আগুন তাদের স্পর্শ করবে না; আর যদি করেও তবে সামান্য হাতে গোনা কয়েকদিনের জন্য স্পর্শ করতে পারে। এগুলো সবই ভিত্তিহীন কথাবাত্রা। আসলেই আল্লাহ্‌র সুন্নতে কোন নড়চড় নেই।

শাহাদা।

প্রতিটি মুসলমানকে সুন্নি মাযহাব মোতাবেক ঘোষনা দিতে হয় যে , "আমি সাক্ষ্য দিতেছি আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিতেছি যে মুহম্মদ আল্লাহ্‌র রসূল।" আরবিতে "আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসূলুল্লাহ।" এই যে সাক্ষ্য দেয়া , একেই শাহাদা বলে। নুতন কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলে সর্ব সমক্ষে এই ঘোষনা পাঠ করতে হয় এবং যারা জন্মগতভাবে মুসলমান , তাদের এই শাহাদা মুখস্ত জানা ও বলা আবশ্যকীয়। অন্যদিকে কেউ যদি এই সাক্ষ্য দিতে রাজি না হয় , তবে সে আর মুসলমান থাকে না। একারনেই এই শাহাদাকে ইসলামের ৫ স্তম্ভের অন্যতম বা প্রধান স্তম্ভ হিসাবে গন্য করা হয়। শুধু তাই নয় , নামাজের ভিতরে এই শাহাদা না পড়লেও নামাজ হয় না।

এখন দেখা যাক , এই অতি গুরুত্বপূর্ন শাহাদা কিভাবে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত হলো। এই শাহাদার উৎপত্তি আবু হুরায়রা থেকে এবং এটা হাদীসগ্রন্থে রসূলের হাদীস হিসাবে লিপিবদ্ধ। এই হাদীসের অনেকগুলো ভার্সান আছে , যা তিরমিজি ও অন্যান্য গ্রন্থে পাবেন। হাদীসটি নিম্নরুপ-সুত্র "Mishkat-ul-Masabih", translation by Maulana Fazlul Karim, Volume 1, Chapter 1, no.27.

একদিন আবু হুরায়রা লোকজনের কাছে যেয়ে বল্লেন , রসূল তাকে বলেছেন লোকজনকে জানাতে যে এখন থেকে এই শাহাদা আবৃত্তি করা লাগবে , " আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসূলুল্লাহ।" অন্য হাদীসে এসেছে " মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু।" আবু হুরায়রা প্রথম যে ব্যক্তির সামনে পড়লেন , তিনি হলেন ২য় খলিফা সায়্যিদিনা ওমর। ওমর তার এই শাহাদার কথা শুনেই তার বুকে ঘুষি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার গলায় পা দিয়ে চেপে ধরে বল্লেন , এই মিথ্যা অবমাননাকর কথা বল , তোমার এত সাহস!! আবু হুরায়রা কাদতে কাদতে বল্লেন , রসূল নিজেই তাকে একথা মানুষজনকে জানাতে বলেছেন। ওমর একথায় সন্তুষ্ট না হয়ে যখন তাকে আরো মারতে লাগলেন , তখন আবু হুরায়রা এক জোড়া চামড়ার জুতা দেখিয়ে বল্লেন , রসূল তাকে এই জুতা জোড়া দিয়েছেন প্রমান হিসাবে। ওমর যখন দেখলেন এটা সত্যিই রসূলের জুতা , তখন তিনি শান্ত হলেন। এরপর থেকে সকলেই খুশিমনে শাহাদা আবৃত্তি করা শুরু করল। সেই শুরু , যা এখনো চলছে।

এই হলো আবু হুরায়রার শাহাদার অবিশ্বাস্য ইতিহাস। এই ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে কিছু প্রশ্নের জবাব জানা প্রয়োজন। প্রথমত আবু হুরায়রা রসূলের সঙ্গ পেয়েছিলেন রসূলের মৃত্যুর আগের ২ বছর। তাহলে ইসলামের প্রথম দিকের মুসলমানরা কোন শাহাদা পড়ে মুসলমান হতেন বা আবৃত্তি করতেন? দ্বিতীয়ত আবু হুরায়রার শাহাদার মধ্যে কি এমন অবমাননাকর বক্তব্য ছিল যে , ওমর এমন ক্ষেপায় ক্ষেপলেন যে আরেক সাহাবীর উপরে চড়াও হয়ে মারধর করলেন? কোরান আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, "মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল।৪৮:২৯"  ওমরের আবু হুরায়রার উপরে চড়াও হয়ে মারধোর করা কি সহানুভূতিশীলতার উদাহরন?

আরেক হাদীসে এই ঘটনার ধারাবাহিকতাই বর্ননা করা হয়েছে যে , ওমর রসূলকে চ্যলেন্জ করে জানতে চেয়েছেন - তিনি সত্যিই কি আবু হুরায়রাকে নিজের জুতা দিয়ে পাঠিয়েছেন মানুষের মাঝে এই শাহাদা প্রচারের জন্য? রসূল উত্তর দিলেন - হ্যা। তখন ওমর দ্বিমত পোষন করে বল্লেন - এই শাহাদা মানুসকে 'অলস' করে ফেলবে। শাহাদা মানুসকে কিভাবে অলস করে ফেলবে , তার ব্যাখ্যা হাদীস বিশারদরাই ভালো দিতে পারবেন। তবে এই অবান্তর হাদীসের বর্ননাকারী ও কিন্তু ঐ আবু হুরায়রা। অবান্তর বল্লাম , কারন এই হাদীস ও কোরানের শিক্ষার পরিপন্থি। ওমর , যিনি একজন মুমীন ছিলেন , তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন -
"মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলেঃ আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তারাই সফলকাম।২৪:৫১"  এরপরেও কি ওমরের পক্ষে সম্ভব রসূলের সাথে দ্বীমত পোষন করা? আমার তো এই হাদীস দুটি রামের জুতা জোড়ার কথা স্মরন করিয়ে দেয় , যা ভরত সিংহাসনে রেখে রামের অবর্তমানে দেশ শাসন করেছিলেন। ইসলামের ভিত্তি কি এইরকম গল্পের উপরে দাড় করানো সম্ভব!!

তবু ও না হয় শাহাদা মেনে নেয়া যেত বা benefit of doubt দেয়া যেত যদি না এই শাহাদা প্রতি নামাজে বৈঠকের সময় আবৃত্তি করা বাধ্যতামূলক  করা হত। কারন এটা শির্কের সমতুল্য।

কোরানের আলোকে আবুহুরায়রার শাহাদা কেন গ্রহনযোগ্য নয় -



 
রসূলের সত্যিকারের শিক্ষার সাথে আবু হুরায়রার শাহাদার বিরোধ কোথায়? রসূলের শিক্ষা হলো কোরানের বানী , যা আল্লাহ তার কাছে নাযিল করেছেন। ওহী পাওয়ার পরে তিনি প্রথমে তার সঙ্গী সাথী বা সাহাবাদের জানিয়েছেন , তারপরে ধীরে ধীরে জগৎ সংসারের বাকি মানুস ,যাদের কাছে এই বানী পৌছেছে , তারা জেনেছে। কোরানকে  আল্লাহর বানী এবং রসূলের হাদীস ও বলা যায় , কারন কোরানের বানী রসূলের মুখ দিয়েই কথা আকারে এসেছে। কোরানের বানী আল্লাহ গ্রন্থাকারে পাঠান নি , যেমনটি তিনি মূসার কাছে পাথরের ট্যবলেটে লিখে পাঠিয়েছিলেন।
একারনেই আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি , রসূলের সত্যিকার শিক্ষাই হলো কোরানের বানী । কোরান ছাড়া বাকি যেসব দাবী করা হয় , তা রসূল পরবর্তী আলেম , ওলামা , মুনাফিকদের বানানো মন গড়া কল্পনা মাত্র , যার সাথে সত্যিকারের ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

আল্লাহ রসূলকে আদেশ করেছেন আমাদের জানানোর জন্য -
"মসজিদসমূহ আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব, তোমরা আল্লাহ তা’আলার সাথে কাউকে ডেকো না।৭২:১৮"

আমরা আবু হুরায়রার শাহাদায় আল্লাহর সাথে সাথে মুহম্মদের সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং তা মসজিদে  নামাজে ও আজানে এই শাহাদা বলার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সাথে মুহম্মদকেও স্মরন করে চলেছি।
আজকের মুসলমান স্কলাররা বলে থাকেন , এটা রসূলের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য বলে থাকেন এবং একি সাথে এটা ও স্মরন করিয়ে দেন যে , এই শাহাদা প্রতি বৈঠকে না পড়লে নামাজ হবে না। এটাকে আল্লাহর উপাসনার সাথে সাথে ব্যক্তি (মুহম্মদ) উপাসনা ছাড়া আর কি বলা সম্ভব? এটাকে শির্ক না বল্লে আর কোনটাকে শির্ক বলবেন?

শুধুমাত্র আল্লাহ।

মানুসের একটা বড় দুর্বলতা হলো , তদের পক্ষে অদেখা গায়েবি আল্লাহ বা গডে বিশ্বাস করা কষ্টকর। এমনকি ইব্রাহিম ও মূসা নবীর ও এই সমস্যা ছিল।
"তারপর মূসা যখন আমার প্রতিশ্রুত সময় অনুযায়ী এসে হাযির হলেন এবং তাঁর সাথে তার পরওয়ারদেগার কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, হে আমার প্রভু, তোমার দীদার আমাকে দাও, যেন আমি তোমাকে দেখতে পাই। তিনি বললেন, তুমি আমাকে কস্মিনকালেও দেখতে পাবে না, .... ৭:১৪৩"

মানুস তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি দিয়েই সব কিছু গ্রহন করতে চায়। একারনেই খৃষ্টানরা জেসাস কে প্রথমে গডের পুত্রে উন্নীত করলো , তারপর স্বয়ং গডেরি অংশ বানিয়ে ফেল্লো। হিন্দুরা মানুস রাম এবং কৃষ্নকে দেবতা বা ভগবান বানিয়ে পুজা করতে শুরু করল। মুসলমানরা ও পিছিয়ে থাকবে কেন?  তারাও মুহম্মদের নামে হামদ্‌ নাথ বানিয়ে , নামাজে তার নাম ঢুকিয়ে , মিলাদ মহফিল করে , তার কবর জিয়ারতকে হজ্বের  সময় আত্যাবশ্যকীয় বানিয়ে , তার সুপারিশকে জান্নাতে ঢোকার চাবি বানিয়ে  , তাকে ঐশী স্তরে নিয়ে গেছে এবং  প্রায় আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে ফেলেছে। আজকের মুসলমানদের তাই মোহামেডান বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

তারা যে মোহামেডান হয়ে গেছে এটা বলার কারনে কত গালিই না সইতে হচ্ছে বা হবে। কোরান ওনলি যিন্দিক শুনতে শুনতে কান ঝালা পালা। বস্তুত তারা খেয়াল করে না , মুহম্মদ নিজেই আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন -

blockquote>"যখন এক (اللَّهُ وَحْدَهُ ) আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে যায়, আর যখন আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্যদের নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তারা আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠে। ৩৯:৪৫"

লক্ষ্য করুন , যদি শুধুমাত্র " লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলা হয় , তাহলে মোহামেডানরা কিভাবে ক্ষেপে ওঠে!! আর যদি এর সাথে "মুহম্মদ রাসুলুল্লাহ" বলা যায় , তাহলে তারা শান্ত হয় ,  আনন্দিত হয়।

আল্লাহ রসূলকে জানিয়েছেন যে এই শাহাদা আসলে হিপোক্রাট মুনাফেকদের শাহাদা। রসূলের চারিপাশে মুনাফেকরা বর্তমান ছিল , রসূল তাদের চিনতেন না।
"আর কিছু কিছু তোমার আশ-পাশের মুনাফেক এবং কিছু লোক মদীনাবাসী কঠোর মুনাফেকীতে অনঢ়। তুমি তাদের জান না; আমি তাদের জানি। ৯:১০১"


একারনে , মুনাফেকরা চিন্তিত ছিল যে , হয়তো বা আল্লাহ তাদের পরিচয় ফাঁস করে দেবেন।
"মুনাফেকরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলমানদের উপর না এমন কোন সূরা নাযিল হয়, যাতে তাদের অন্তরের গোপন বিষয় অবহিত করা হবে। সুতরাং আপনি বলে দিন, ঠাট্টা-বিদ্রপ করতে থাক; আল্লাহ তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন যার ব্যাপারে তোমরা ভয় করছ।৯:৬৪"


আল্লাহ রসূলকে তাদের পরিচয় ফাঁস করেছেন-
"মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলেঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।৬৩:১"


তাহলে দেখতে পাই মুনাফিকরাই সাক্ষ্য দেয় , মুহম্মদ আল্লাহর রসূল। এটাই আবু হুরায়রার শাহাদার দ্বিতীয় অংশ।

আল্লাহ কোরানে বলেছেন , আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। আর কোন সাক্ষীর প্রয়োজন নেই।



مَّا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ وَأَرْسَلْنَاكَ لِلنَّاسِ رَسُولاً وَكَفَى بِاللّهِ شَهِيدًا

আপনার যে কল্যাণ হয়, তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আর আপনার যে অকল্যাণ হয়, সেটা হয় আপনার নিজের কারণে। আর আমি আপনাকে পাঠিয়েছি মানুষের প্রতি রসূল হিসাবে। আর আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। ৪:৭৯




আল্লাহ আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন তিনি যে তা সজ্ঞানেই করেছেন, সে ব্যাপারে আল্লাহ নিজেও সাক্ষী এবং ফেরেশতাগণও সাক্ষী। আর সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। ৪:১৬৬


এ ছাড়াও আল্লাহ রসূলদের ব্যাপারে সাক্ষী হতে নিরুৎসাহিত করেছেন এবং এটা সম্ভবও নয় কেউ যে রসূল , তার সাক্ষ্য দেয়া। নবীর কাছে যে ওহী আসে তা আল্লাহ ছাড়া আর কোন মানুসের পক্ষে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে জানা সম্ভব না।


"মূসাকে যখন আমি নির্দেশনামা দিয়েছিলাম, তখন আপনি পশ্চিম প্রান্তে ছিলেন না এবং আপনি প্রত্যক্ষদর্শীও ছিলেন না।২৮:৪৪"





তাহলে সঠিক শাহাদা কোনটি , যা মুসলমানরা দৃঢ়তার সাথে ঘোষনা দিতে পারে বা যা ঘোষনা করে নব্য মুসলমানরা মুসলমানদের দলভুক্ত হতে পারে? হয়তো বা সাহাবারা এই একি প্রশ্ন আমাদের নবী মুহম্মদকেও করেছিলেন এবং হয়তো বা তিনি উত্তর দিয়েছিলেন -

"তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন বিচারক অনুসন্ধান করব, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত গ্রন্থ অবতীর্ন করেছেন? আমি যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করেছি, তারা নিশ্চিত জানে যে, এটি আপনার প্রতি পালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবর্তীর্ন হয়েছে। অতএব, আপনি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।৬-১১৪-১১৫"


তাহলে দেখা যাচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর বা শাহাদা অবশ্যই কোরানে থাকতে হবে। ইব্রাহিম নবী এর প্রকৃষ্ট উদাহরন -

"যে আল্লাহর কাছে নিজেকে (أَسْلَمَ وَجْهَهُ) সমর্পন করে , সৎকাজে নিয়োজিত থাকে এবং ইব্রাহীমের ধর্ম অনুসরণ করে, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন, তার চাইতে উত্তম ধর্ম কার? আল্লাহ ইব্রাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।৪:১২৫"


স্মরনে রাখা প্রয়োজন যে , এই আয়াতটি আমাদের নবীর কাছে নাযিল হয়েছিল এবং তিনিই প্রথমে সাহাবীদের কাছে এই আয়াত তেলোয়াত বা আবৃত্তি করেছিলেন , অতঃপর কোরানের মাধ্যমে এই আয়াত আমাদের কাছে পৌছেছে। সুতরাং আমাদের সকলের উচিৎ ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসরন করা।

"ইব্রাহীমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফেরায়? কিন্তু সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।২:১৩০"


শুধু বোকারাই ইব্রাহীমের ধর্ম থেকে মুখ ফেরায়। তাহলে মুসলমানদের , যারা কোরানে বিশ্বাস করে ও বোকা না হতে চায় , তাদের উচিৎ ইব্রাহিম যা করতো , তাই করা। ইব্রাহিম কি করতো? পরের আয়াতেই তা বলা আছে -

"স্মরণ কর, যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেনঃ নিজেকে সমর্পন কর(أَسْلِمْ)। সে বললঃ আমি বিশ্বপালকের কাছে নিজেকে সমর্পন করলাম (أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ)।২-১৩১"


এটাই , যা আমরা খুজতেছি। যখন আল্লাহ ইব্রাহিমকে সঠিক ধর্মের নির্দেশনা দিলেন , তখন তিনি ইব্রাহিমকে আত্মসমর্পন (আসলিমু) করতে বল্লেন এবং ইব্রাহিম বল্লেন,
"আসলামতু লি রাব্বিল আলামিন"।
এভাবেই সকল মুসলমানের ঘোষনা বা শাহাদা হওয়া উচিৎ।  কোন কোর্টে যদি কেউ সাক্ষ্য দেয় , " হুজুর , আমি চোখে দেখিনি বা ঘটনাস্থলেও উপস্থিৎ ছিলাম না" , তাহলে সেই সাক্ষ্য কোন জড়বুদ্ধি সম্পন্ন মানুস ছাড়া আর কারো কাছে গ্রহনযোগ্য হবে কি? তেমনি আবু হুরায়রার শাহাদাও গ্রহনযোগ্য নয়। কারন আমরা কেউ আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখিনি বা মুহম্মদের নবুয়ত্ব পাওয়ার বা রসূল হওয়ার ঘটনাস্থলে উপস্থিৎ ছিলাম না। এব্যপারে আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। দেখুন শাহাদা।(সাক্ষ্য) (২)

ইব্রাহিমের গল্পের ধারাবাহিকতায় পরের আয়াত-

"এরই ওছিয়ত করেছে ইব্রাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকুবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলমান না হয়ে (আত্মসমর্পন না করে) কখনও মৃত্যুবরণ করো না।২:১৩২"


"তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বললঃ আমার পর তোমরা কার এবাদত করবে? তারা বললো, আমরা তোমার পিতৃ-পুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের এবাদত করব। তিনি একক উপাস্য। আমরা সবাই তাঁর কাছে আত্মসমর্পন করলাম।২:১৩৩"


তাহলে দেখা যাচ্ছে ইব্রাহিম ও তার বংশধরগন সকলেই আল্লাহর কাছেই আত্মসমর্পন করেছিলেন। এটাই সত্য ঘটনা , এটাই কোরানের বানী। কোরানে আমাদের নবীকে আদেশ করা হয়েছে ইব্রাহিমকে অনুসরন করার জন্য। -

"তারা বলে, তোমরা ইহুদী অথবা খ্রীষ্টান হয়ে যাও, তবেই সুপথ পাবে। আপনি বলুন, কখনই নয়; বরং আমরা ইব্রাহীমের ধর্মে আছি যাতে বক্রতা নেই। সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম.....। ।২:১৩৫-১৩৬"


এই একি নির্দেশনা আল্লাহ কোরানে আবারো দিয়েছেন এবং যারা এই সত্যকে গোপন করে তাদের জন্য -

"অথবা তোমরা কি বলছ যে, নিশ্চয়ই ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব (আঃ) ও তাদের সন্তানগন ইহুদী অথবা খ্রীষ্টান ছিলেন? আপনি বলে দিন, তোমরা বেশী জান, না আল্লাহ বেশী জানেন? তার চাইতে অত্যাচারী কে, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে প্রমাণিত সাক্ষ্যকে গোপন করে? আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন। ২:১৪০"


তাহলে মানুস কেনো এই শাহাদা বা সাক্ষ্য গোপন করে? ইব্রাহিম ঘোষনা দিয়েছিলেন -
"আসলামতু লি রাব্বিল আলামিন"। অর্থাৎ আমি দুই জাহানের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পন করলাম।
এবং তিনি তার সন্তানদের ও জ্যকবকেও এই একি কাজ করতে আদেশ  করেছিলেন।

আমাদের নবী ও সাহাবাদের ও এই একি শাহাদা দেয়া হয়েছিল । তাহলে কেন আজ সকলে সঠিক শাহাদা গোপন করে  মুনাফিকদের শাহাদা আকড়ে ধরে আছে?

এতে কোনই সন্দেহ নেই যে , আমাদের রসূল ইব্রাহিমের বিশ্বাসকেই অনুসরন করেছিলেন।

"অতঃপর আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছি যে, ইব্রাহীমের দ্বীন অনুসরণ করুন, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং শির্ককারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।১৬:১২৩"


আমাদের নবী ও আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী ঠিক এটাই করেছিলেন। যদি কেউ  মুসলমান হতে চায় , তবে তাকে নবী যেমন ইব্রাহিমের মতো আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করেছিলেন , তেমনি আত্মসমর্পন করা উচিৎ নয় কি?

"মানুষদের মধ্যে যারা ইব্রাহীমের অনুসরণ করেছিল, তারা, আর এই নবী এবং যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে তারা ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠতম-আর আল্লাহ হচ্ছেন মুমিনদের বন্ধু।৩:৬৮"
"বলুন, যখন আমার কাছে আমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণাদি এসে গেছে, তখন আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাকে ডাকো , তার এবাদত করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আমাকে আদেশ করা হয়েছে বিশ্ব পালনকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পন করতে।(ওয়া উমিরতু আন আসলিমা লি রাব্বিল আলামিন) ৪০:৬৬"


যদি কেউ এটা নিয়ে বাদানুবাদ করে , তবে তার জবাব ও কোরানে আছে -
""যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয় তবে বলে দাও, "আমি এবং আমার অনুসরণকারীগণ আল্লাহর প্রতি আত্নসমর্পণ করেছি।"...৩:২০


রসূল ও তার অনুসারীরা সোজা ভাষায় আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করেছিলেন।
"আপনি বলে দিনঃ আমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে আহবান করব, যে আমাদের উপকার করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না এবং আমরা কি পশ্চাৎপদে ফিরে যাব, এরপর যে, আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন? ঐ ব্যক্তির মত, যাকে শয়তানরা বনভুমিতে বিপথগামী করে দিয়েছে-সে উদভ্রান্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে। তার সহচররা তাকে পথের দিকে ডেকে বলছেঃ আস, আমাদের কাছে। আপনি বলে দিনঃ নিশ্চয় আল্লাহর পথই সুপথ। আমরা আদিষ্ট হয়েছি যাতে স্বীয় পালনকর্তা কাছে নিজেকে সমর্পন করি।৬:৭১"


অনেকে বলতে পারেন এই শাহাদা আমার কল্পনা প্রসূত। না এটা আমার কল্পনা নয়। এর বর্ননা কোরান থেকেই নেয়া। রানী শেবা মতান্তরে বিলকিছ যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে মুসলমান হয়েছিলেন তখন এই শাহাদা পড়েছিলেন -
"তাকে বলা হল, এই প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করল সে ধারণা করল যে, এটা স্বচ্ছ গভীর জলাশয়। সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেলল। সুলায়মান বলল, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ। বিলকীস বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি।
আমি সুলায়মানের সাথে বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্নসমর্পন করলাম।২৭:৪৪"


সঠিক শাহাদা-
 
"আসলামতু লিল্লাহে রাব্বিল আলামিন" আমি বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করলাম।





Monday, April 25, 2011

স্ত্রী প্রহার !!

আগে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম কোরানানুযায়ী জীবনযাপন করলে মুশ্কিল্টা কি তা জানার জন্য। কোরান স্কেপ্টিকরা কয়েকটি মুশ্কিলের কথা জানিয়েছেন , যার অন্যতম স্ত্রী প্রহার। আজ স্ত্রী প্রহার নিয়ে আলোকপাত করব। বাকিগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা থাকল।



মুসলিম দেশগুলোতে অতি সামান্য কারনে (রান্না কেন ভাল হয় নি , এইরকম তুচ্ছ কোন বিষয়) বউ পেটানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও বউ পেটায় , যার অহরহ নজীর আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে থাকি কিন্তু সেটা আমার বিবেচ্য বিষয় নয়। কারন মুসলমানরা বউ পেটায় ধর্মীয়ভাবে জায়েজ করে। আমাদের ধর্মগুরুরা গত হাজার বছর ধরে বউ পেটানোর সমর্থনে কোরানের ৪:৩৪ নং আয়াত নিয়ে খাড়া হয়ে যান। এখন আমি যদি বলি এই আয়াতটির ভুল মানে করা হচ্ছে গত হাজার বছর ধরে , তাহলে আস্তিক নাস্তিক ও কোরান স্কেপ্টিক সকলেই একবাক্যে প্রতিবাদ করে উঠবে , হাজার বছর ধরে কেউ কিছু বুঝলো না , তুমি কোথাকার দিগপাল এলে যে , তোমার চোখেই এই ভুল ধরা পড়লো!! দেখুন কপের্নিকাসের আগ পর্যন্ত আবহমানকাল ধরে মানুষ বিশ্বাস করতো , সূর্য পৃথিবীর চার দিকে ঘোরে। তাই বলে কি এটা সত্য? গত হাজার বছর ধরে কোরানের আয়াতকে ভুল ব্যাখ্যা করলে , ব্যাখ্যাটা সত্য হয়ে যায় না। তাই সকলের কাছে অনুরোধ খোলামন নিয়ে (অর্ধেক খালি নয় , অর্ধেক ভর্তি চিন্তা নিয়ে) পোস্টের বাকি অংশ পড়ুন তাহলেই কোরানের মহিমা বুঝতে পারবেন।



৪:৩৪ "পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে ('নুশুয' نُشُوزَ)অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং ('ইদরিবুহুন্না'وَاضْرِبُوهُنَّপ্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।"

যদি আল্লাহ সত্যি সত্যিই অবাধ্যতার জন্য স্ত্রী প্রহার করতে বলে থাকেন , তাহলে মুসলমানদের জন্য বউ পেটানো অবশ্য করনীয়। মুসলমানরা আল্লাহর আদেশ মানতে বাধ্য। আসলেই কি আল্লাহ বউ পেটাতে বলেছেন ? চলুন দেখি কোরান থেকেই এর কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কিনা।



কোরানের কোন শব্দের সঠিক মানে জানতে হলে , ঐ একি শব্দ দিয়ে কোরানের অন্য আয়াতে কি বোঝানো হয়েছে , সেটা জানা জরুরী। এই পদ্ধতিকে বলে 'তারতীল' , যার কথা বলা হয়েছে ৭৩:৪ নং আয়াতে।



বউ পেটানোর আয়াতটির সঠিক মানে জানতে হলে ২ টা শব্দের মানে জানা জরুরী , যা আমি আরবিতে দিয়েছি।


১) নুশুয (যার মানে করা হয়েছে অবাধ্যতা)

২) ইদরিবুহুন্না (মানে করা হয়েছে প্রহার কর)


'নুশুয'এর সঠিক মানে জানলে আয়াতটি কি নিয়ে তা জানা যাবে এবং সে কালের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষ শ্রেষ্ঠ , এই চিন্তা মাথায় রেখেই যে আমাদের আলিম ও ইমামরা ঐ রকম অনুবাদ করেছিলেন , তা পরিস্কার হবে।

'নুশুয' এর অর্থ - উঠে যাওয়া / `to rise / go above'

কোন স্থান থেকে উঠে যাওয়াই যে 'নুশুয'এর মানে , তা পরিস্কার হবে ৫৮:১১ নং আয়াত পড়লে।



"মুমিনগণ, যখন তোমাদেরকে বলা হয়ঃ মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও। আল্লাহর জন্যে তোমাদের জন্য প্রশস্ত করে দিবেন। যখন বলা হয়ঃ ('এনশুযু'انشُزُو উঠে যাও, তখন উঠে যেয়ো। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর।"

৪:৩৪ আয়াতে স্ত্রী কতৃক স্বামীকে ছেড়ে চলে যাওয়া বা উপেক্ষার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে , অবাধ্যতার কথা বলা হয় নি। এখনো যদি এটা বিশ্বাস না হয় তাহলে ৪:১২৮ নং আয়াত দেখুন , যেখানে স্বামী কতৃক স্ত্রীকে উপেক্ষার কথা বলা হয়েছে ও একি শব্দ 'নুশুয' ব্যবহৃত হয়েছে।


"যদি কোন নারী স্বীয় স্বামীর পক্ষ থেকে (نُشُوزً)অসদাচরণ কিংবা উপেক্ষার আশংকা করে, তবে পরস্পর কোন মীমাংসা করে নিলে তাদের উভয়ের কোন গোনাহ নাই। মীমাংসা উত্তম। মনের সামনে লোভ বিদ্যমান আছে। যদি তোমরা উত্তম কাজ কর এবং খোদাভীরু হও, তবে, আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।"

একি কাজের জন্য তো আর দুই রকম নির্দেশ হতে পারে না। স্বামী উপেক্ষা করলে মিমাংসা আর স্ত্রী উপেক্ষা করলে প্রহার। এখন দেখি 'ইয়াদরিবুহুন্না' মানে কি?

'ইয়াদরিবুহুন্না' র মূল হলো 'দারাবা"। দারাবা অনেক আয়াতে আছে , এবং এর ভিন্ন ভিন্ন মানে করা হয়েছে। নিম্নের আয়াত থেকে দারাবার মানে আমরা নিতে পারি।

২:২৭৩ "খয়রাত ঐ সকল গরীব লোকের জন্যে যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে-জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র (ضَرْبًا) ঘোরাফেরা করতে (যেতে) সক্ষম নয়। "

এখান থেকে আমরা ইয়াদরিবুহুন্নার মানে নিতে পারি যেতে দেয়া। তাহলে ৪:৩৪ এর মানে দাড়ায় -

"পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তত্বশীল এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোক চক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে ('নুশুয' نُشُوزَ)চলে যাওয়ার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং ('ইদরিবুহুন্না'وَاضْرِبُوهُنَّযেতে দাও যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।"

দেখুন তো আল্লাহর আইন কত সুন্দর। স্বামী , স্ত্রী উভয়ের সমাধিকার।


৩৯:১৮ যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।











Thursday, April 14, 2011

আমাদের এই মহাবিশ্ব কোথা থেকে এসেছে? (২)

পাখির বিষ্ঠা।




আজকের দুনিয়ায় বিগ ব্যাঙ থিওরী সর্বজন বিদিত ও বিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত ও স্বীকৃত। তবে শুরুতে কেউই বিগ ব্যাঙ থিওরীকে পাত্তা দেয় নি , উড়িয়ে দিয়েছিল। যে কজন এই থিওরীকে সমর্থন করেছিল , তারা ভবিষ্যতবাণী করে যে বিগ ব্যাঙের বিষ্ফোরনের ফলে তাপ থেকে সৃষ্ট মাইক্রো-ওয়েভ তরঙ্গের বিকিরন এখনো অবশিষ্ট আছে।



১৯৬৫ সালে নিউ জার্সীতে বেল ল্যাবরেটরীর দুজন বিজ্ঞানী প্রায় হঠাৎ করেই একটা বড় রেডিও ডিশ-এন্টেনার মাধ্যমে এই তাপ থেকে সৃষ্ট মাইক্রো-ওয়েভ তরঙ্গের সন্ধান পেয়ে যান। পৃথিবীর সবচেয়ে সুক্ষ পরিবর্তন নির্ণয়ে সক্ষম রেডিও ডিশ-এন্টেনাকে টিউনিং করার সময় একটি ঝির ঝির শব্দ আর্নো পেন্জিয়াস ও রবার্ট উইলসনকে জ্বালাতন করছিল। কারন এন্টেনাকে আকাশের যেদিকেই ঘুরান না কেন , সকল দিক থেকেই ঝির ঝির শব্দটি আসছিল। তারা প্রথমে ভেবেছিলেন , এটা পাখির বিষ্ঠা (গু) । তাদের এন্টেনাটি এতই সুক্ষ ছিল যে , ডিশ-এন্টেনার উপরে পাখি বিষ্ঠা ত্যাগ করলে , সদ্য নির্গত সেই বিষ্ঠা গরম থাকার ফলে ওটার তাপ থেকে সৃষ্ট বিকিরনকে ও এই এন্টেনাটি ধরতে পারত। ডিশ-এন্টেনা থেকে সেই বিষ্ঠা পরিস্কার করার পরে ও দেখা গেল ঐ ঝির ঝির শব্দ আসা বন্ধ হচ্ছে না।



একবছর ধরে এই ঝির ঝির শব্দের ডাটা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরীক্ষা করে তারা এই স্বীদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই ঝির ঝির শব্দটিই হলো ১৩০০ কোটি বছর পূর্বে বিগ ব্যাঙের বিষ্ফোরনের ফলে তাপ থেকে সৃষ্ট মাইক্রো-ওয়েভ তরঙ্গের বিকিরন। তাকে বলা হল কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা সিএমবি (CMB)। সিএমবি আবিষ্কারকদের নোবেল পুরস্কার দেয়া হল, যদিও এই বিকিরণের ভাবীকথন অনেক তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা আগেই করেছিলেন এবং সেই সাথে বিগ ব্যাঙ নিয়ে বিজ্ঞানীদের সকল অবিশ্বাস ও সন্দেহ দুর হলো। (আপনার টেলিভিশন চ্যানেল পরিবর্তনের সময় যে চ্যানেলে কোন প্রোগ্রাম থাকে না , সেখানে যে ঝির ঝির শব্দ শোনা যায় , ওটাই সিএমবি (CMB))



এক সাক্ষাৎকারে আর্নো পেন্জিয়াসকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল , বিগ ব্যাঙ থিওরী শুরুতেই কেন এত বাধার সম্মুখীন হয়েছিল? কেন মূলধারার বিজ্ঞানীরা একে মেনে নেন নি?



জবাবে আর্নো পেন্জিয়াস বলেন - "বেশিরভাগ পদার্থবিজ্ঞানী ব্যাখ্যা ছাড়াই এই মহাবিশ্বের বর্ণনা দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। এবং বিজ্ঞান যেহেতু কোন কিছুর ব্যাখ্যা দেয় না , শুধু বর্ণনাই দেয় , সেহেতু মূলধারার বিজ্ঞানীদের বিগ ব্যাঙ থিওরী শুরুতেই মেনে না নেয়াটাই কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন। আমাদের এই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব যদি চিরস্থায়ী হয়ে থাকে , তাহলে এর কোন ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না , নয় কী?"



"কেউ একজন জিজ্ঞাসা করল , 'কোন এক কোম্পানির সকল সেক্রেটারিই মহিলা কেন'? আপনি উত্তরে বলতে পারেন , 'কোম্পানির শুরু থেকেই এমনটাই হয়ে আসছে।' এটা ব্যাখ্যা না দিয়েই পার পাওয়ার একটি পন্থা। ঠিক এমনি ভাবে যে সকল থিওরীর কোন ব্যাখ্যা লাগে না সেগুলোকেই সাধারনত বিজ্ঞান গ্রহণ করে এবং এভাবেই বিজ্ঞান খুব সুন্দর ভাবে কাজ করে চলেছে।"



"মহাবিশ্ব চিরস্থায়ীর ধারনা বা পুরাতন থিওরীটা এতই কুৎসীত যে সেটাকে মানুষ পরিত্যাগ করেছে। এর বদলে নুতন ও সহজতম থিওরীটা হলো - শুন্য থেকে সৃষ্টি , এই মহাবিশ্বের শুন্য (সরিষার দানা?) থেকে মহা বিষ্ফোরনের মাধ্যমে অস্তিত্ব লাভ। সাধারন বাংলায় যাকে বলে - 'হাওয়া থেকে পাওয়া'।"



রবার্ট উইলসনকে সাংবাদিক ফ্রেড হীরেন জিজ্ঞাসা করেছিলেন ," বিগ ব্যাঙ কোন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের ইঙ্গিত করে কী না?"



উইলসন বললেন ," কিছু একটা তো অবশ্যই বারুদে ম্যাচের কাঠি ঠোকার কাজটা করেছিল। আর আপনি যদি ধার্মিক হোন , তাহলে এর থেকে ভাল কোন থিওরী তো আমার মাথায় আসে না।"



পরবর্তি পর্বে থাকবে - " বিগ ব্যাঙ কেন ইতিহাসের সুক্ষতম পরিকল্পিত ঘটনা?"





Tuesday, March 8, 2011

চোরের শাস্তি।(শেষ অংশ)

৩য় মতানুযায়ী কুরআনের নৈতিকতা স্মরনে রেখে বলা হয়েছে চোরদের হাত নয় , তাদের চুরির সহায়তাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের কেটে ফেলতে অর্থাৎ তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। এই মতের সমর্থনে ৩টি কারন দর্শানো হয়েছে।




১ম কারন - সকলেই জানেন বাংলায় কিছু শব্দ আছে যার আক্ষরিক ও আলঙ্করিক দুই ধরনের মানে করা হয়। যেমন – যদি বলা হয় আমার হাত ব্যাথা করছে। এখানে ‘হাত’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থেই হাতকে বোঝায়। কিন্তু যদি বলি , আমার খুব হাত টানাটানি যাচ্ছে। এখানে নিশ্চয় কেউ আমার হাত ধরে টানাটানি করছে না। এখানে হাতের আলঙ্করিক অর্থ বোঝানো হয়েছে , অর্থাৎ আমার টাকা বা সম্পদের অভাব ঘটেছে।



সহায়তাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের বুঝাতে বাংলায় বা ইংরাজীতে বা আরবিতেও ‘হাত’ শব্দটি ব্যাবহৃত হয়। যেমন এরশাদ শিকদারের ডান হাত বা right hand man ছিল অমুক , এটা বলতে আমরা বুঝি এরশাদ শিকদারের প্রধান সহায়তাকারী ছিল অমুক। অমুকের পক্ষে এ কাজটা করা সম্ভব ছিল না , যদি না তমুকের হাত ওর পিছনে থাকত!! এখানে পৃষ্ঠপোষককে বুঝানো হয়েছে। কোন চোরের পক্ষে সহায়তাকারী ও পৃষ্ঠপোষক ছাড়া একা চুরি করা দূরুহ। তাকে চুরির মাল কারো না কারো কাছে বেচা লাগবে , কারো না কারো সহায়তা তার লাগবে। একারনেই সহায়তাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের তার কাছ থেকে কেটে বা বিচ্ছিন্ন করে ফেল্লেই , তার চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এই বিচ্ছিন্ন কিভাবে করতে হবে তার বর্ননাও কুরআনে আছে। সে বর্ননায় পরে আসছি।



তদ্রুপ কুরআনেও ‘হাত’ (ইয়াদ) শব্দটি আক্ষরিক ও আলঙ্করিক অর্থে ব্যাবহৃত হয়েছে। প্রমানস্বরুপ ২৭:১২ , ৫:৬৪ , ৩৮:৪৫ আয়াতগুলো পড়ে দেখুন।



২৭:১২ “আপনার হাত আপনার বগলে ঢুকিয়ে দিন, সুশুভ্র হয়ে বের হবে নির্দোষ অবস্থায়। এগুলো ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের কাছে আনীত নয়টি নিদর্শনের অন্যতম। নিশ্চয় তারা ছিল পাপাচারী সম্প্রদায়।”

এই আয়াতে ‘হাত’ (ইয়াদ) শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ব্যাবহৃত হয়েছে।



৫:৬৪ “আর ইহুদীরা বলেঃ আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। তাদেরই হাত বন্ধ হোক। একথা বলার জন্যে তাদের প্রতি অভিসম্পাত। বরং তাঁর উভয় হস্ত উম্মুক্ত। তিনি যেরূপ ইচ্ছা ব্যয় করেন।….” এই আয়াতে ‘হাত’ (ইয়াদ) শব্দটি আলঙ্করিক অর্থে ব্যাবহৃত হয়েছে। এখানে হাত বন্ধ বলতে কৃপনতা বোঝায়।



৩৮:৪৫ “স্মরণ করুন, হাত ও চোখের অধিকারী আমার বান্দা ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কথা।” এখানেও ‘হাত’ (ইয়াদ) শব্দটি আলঙ্করিক অর্থে ব্যাবহৃত হয়েছে। আরো দেখতে পারেন ২:১৯৫, ২:২৩৭ ও ২২:১০ আয়াতগুলি।



তাহলে ৫:৩৮ আয়াতের তর্জমা যদি “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের সহায়তাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের তাদের কাছ থেকে কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে হুশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়।” এভাবে করা হয় তাহলে দেখুন ৫:৩৯ নং আয়াতের সাথেও কোন বিরোধ থাকে না।



৫:৩৯ “অতঃপর যে তওবা করে স্বীয় অত্যাচারের পর এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয় আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।”



২য় কারন - মানুষ খুন করা নিশ্চয় চুরি করার থেকেও জঘন্য অপরাধ। কুরআনে খুনীর জন্য দুই ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। ৪:৯২ আয়াতে বিশ্বাসীদের অনিচ্ছাকৃত খুনের শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে। এই শাস্তি মৃত্যুদন্ড ও নয় বা জেল বাস ও নয়। ৪:৯২ “মুসলমানের কাজ নয় যে, মুসলমানকে হত্যা করে; কিন্তু ভুলক্রমে। যে ব্যক্তি মুসলমানকে ভূলক্রমে হত্যা করে, সে একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং রক্ত বিনিময় সমর্পন করবে তার স্বজনদেরকে; কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে দেয়। অতঃপর যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং যদি সে তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে রক্ত বিনিময় সমর্পণ করবে তার স্বজনদেরকে এবং একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে। অতঃপর যে ব্যক্তি না পায়, সে আল্লাহর কাছ থেকে গোনাহ মাফ করানোর জন্যে উপর্যুপুরি দুই মাস রোযা রাখবে। আল্লাহ, মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।”



ইচ্ছাকৃত খুনের শাস্তি – ২:১৭৮ “হে ঈমানদারগন! তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কেসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেয়া হয়, তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যাক্তি বাড়াবাড়ি করে, তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।”



দুটো আয়াতেই দেখুন ক্ষতিপুরন দেয়া ও ক্ষতিপুরন দিয়ে মৃত্যুদন্ড রহিতের ব্যাবস্থা রাখা হয়েছে। এটা হয়তোবা খুন হওয়া ব্যাক্তির পরিবারের ভরনপোষনের স্বার্থে করা হয়েছে। খুনীর এই যে শাস্তি , এটা নিশ্চয় চোরের হাত কেটে ফেলার শাস্তির চেয়ে বেশী নয়। চুরির শাস্তি তো আর খুনের শাস্তির চেয়ে বেশি হতে পারেনা?



৩য় বা শেষ কারন আল্লাহ সুরা ইউসুফে (১২) উদাহরন দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন , চোরের শাস্তি কিভাবে দিতে হবে।



১২:৭০ অতঃপর যখন ইউসুফ তাদের রসদপত্র প্রস্তুত করে দিল, তখন পানপাত্র আপন ভাইয়ের রসদের মধ্যে রেখে দিল। অতঃপর একজন ঘোষক ডেকে বললঃ হে কাফেলার লোকজন, তোমরা অবশ্যই চোর।

১২:৭১ তারা ওদের দিকে মুখ করে বললঃ তোমাদের কি হারিয়েছে?

১২:৭২ তারা বললঃ আমরা বাদশাহর পানপাত্র হারিয়েছি এবং যে কেউ এটা এনে দেবে সে এক উটের বোঝা পরিমাণ মাল পাবে এবং আমি এর যামিন।

১২:৭৩ তারা বললঃ আল্লাহর কসম, তোমরা তো জান, আমরা অনর্থ ঘটাতে এদেশে আসিনি এবং আমরা কখনও চোর ছিলাম না।

১২:৭৪ তারা বললঃ যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও, তবে যে, চুরি করেছে তার কি শাস্তি?

১২:৭৫ তারা বললঃ এর শাস্তি এই যে, যার রসদপত্র থেকে তা পাওয়া যাবে, এর প্রতিদানে সে দাসত্বে যাবে। আমরা যালেমদেরকে এভাবেই শাস্তি দেই।

১২:৭৬ অতঃপর ইউসুফ আপন ভাইদের থলের পূর্বে তাদের থলে তল্লাশী শুরু করলেন। অবশেষে সেই পাত্র আপন ভাইয়ের থলের মধ্য থেকে বের করলেন। এমনিভাবে আমি ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম। সে বাদশাহর আইনে আপন ভাইকে কখনও দাসত্বে দিতে পারত না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করেন। আমি যাকে ইচ্ছা, মর্যাদায় উন্নীত করি এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে আছে অধিকতর এক জ্ঞানীজন।

১২:৭৭ তারা বলতে লাগলঃ যদি সে চুরি করে থাকে, তবে তার এক ভাইও ইতিপূর্বে চুরি করেছিল। তখন ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে রাখলেন এবং তাদেরকে জানালেন না। মনে মনে বললেনঃ তোমরা লোক হিসাবে নিতান্ত মন্দ এবং আল্লাহ খুব জ্ঞাত রয়েছেন, যা তোমরা বর্ণনা করছ;

১২:৭৮ তারা বলতে লাগলঃ হে আযীয, তার পিতা আছেন, যিনি খুবই বৃদ্ধ বয়স্ক। সুতরাং আপনি আমাদের একজনকে তার বদলে রেখে দিন। আমরা আপনাকে অনুগ্রহশীল ব্যক্তিদের একজন দেখতে পাচ্ছি।

১২:৭৯ তিনি বললেনঃ যার কাছে আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া আর কাউকে গ্রেফতার করা থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। তা হলে তো আমরা নিশ্চিতই অন্যায়কারী হয়ে যাব।”



উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহর আইনে চুরির শাস্তির প্রয়োগ কিভাবে হবে তা দেখানো হয়েছে।

১২:৭ “অবশ্য ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের কাহিনীতে জিজ্ঞাসুদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।”

১২:৩৮ “আমি আপন পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্ম অনুসরণ করছি। আমাদের জন্য শোভা পায় না যে, কোন বস্তুকে আল্লাহর অংশীদার করি। এটা আমাদের প্রতি এবং অন্য সব লোকের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। কিন্ত অধিকাংশ লোক অনুগ্রহ স্বীকার করে না।”



উপরের আয়াতগুলো থেকে এটা পরিস্কার তারা রাজার আইন (১২:৭৬) অনুসরন করেনি , বরং চোরকে শাস্তি দিয়েছে আল্লাহর আইনে(১২:৭৫)। লক্ষ করুন ওরা ১২:৩৮ “আমি আপন পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্ম অনুসরণ করছি।”






দেখা যাচ্ছে আল্লাহর আইনে চোরের শাস্তি নিম্নরুপ :


১) সন্দেহভাজন চোরকে প্রথমেই চুরি স্বীকার করার সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং স্বীকার করে চুরির মাল ফেরৎ দিলে পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।১২:৭২


২)৫:৩৮ চুরি প্রমান হলে তার সহায়তাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের থেকে কেটে ফেলা হবে অর্থাৎ সে দাসত্বে যাবে।১২:৭৫ এর অর্থ দাড়ায় চোরাই মালের টাকা বা জরিমানার সমপরিমান অর্থ চোর শ্রম মজুরি দিয়ে শোধ দিবে।



এখন দেখুন এরপরে যদি চোর ক্ষমা চায় ও অনুতপ্ত হয় , তাহলে তাকে ক্ষমা করা সম্ভব।

আয়াতগুলো থেকে আমরা আরো জানতে পারি যে কাউকে চুরির দায়ে ফাসানো সম্ভব। হাত কেটে ফেল্লে যার চুরির মিথ্যা অভিযোগে হাত কাটা গেছে , তার হাত কিভাবে ফেরৎ দেয়া যাবে। আর চুরির শাস্তি যদি হাত কেটেই ফেলা হবে , তাহলে নিশ্চয় ইউসুফ নিজের আদরের ভাইকে চুরির দায়ে ফাসাতো না।



আজকের মুসলমান ভাইয়েরা বলতে পারেন , এই আইন সেই ইউসুফের জমানার জন্য প্রযোজ্য ছিল , আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এর উত্তরে বলব , আল্লাহ আমাদের এই কাহিনী শুনিয়েছেন কিছু শেখানোর জন্য , আনন্দ উপভোগের জন্য নয়।



পোস্টের শুরু করেছিলাম সূরা ইউসুফের ১ম আয়াত দিয়ে , শেষ করছি শেষ আয়াত দিয়ে।





১২:১১১ তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোন মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্যে পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত ও হেদায়েত।






চোরের শাস্তি

১২:১-৩ “আলিফ-লাম-রা; এগুলো সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত। আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার। আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করেছি, যেমতে আমি এ কোরআন তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছি। তুমি এর আগে অবশ্যই এ ব্যাপারে অনবহিতদের অন্তর্ভূক্ত ছিলে।”


কোরআনে চুরির শাস্তির কথা কি বলা হয়েছে?

৫:৩৮ আয়াতে চুরির জন্য জন্য নির্ধারিত শাস্তির বর্ননা দেয়া আছে।

৫:৩৮ “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে ‘এক্‌তা’উ’ ‘আইদিয়াহুমা’ তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে হুশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়।”
৫:৩৯ “অতঃপর যে তওবা করে স্বীয় অত্যাচারের পর এবং সংশোধিত হয়, নিশ্চয় আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।”

আরবি শব্দ ‘এক্‌তা’উ’ অর্থ “কাটো” , আর ‘আইদিয়াহুমা’ অর্থ “হাতগুলো” (তিন বা ততোধিক)।

৫:৩৮ শাব্দিক অর্থ দাড়ায় – “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাতগুলো (তিন বা ততোধিক) কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে হুশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়।”

হাতগুলো কতটুকু কাটতে হবে , তার দুই ধরনের মত পাওয়া যায়।

১ম মতানুযায়ী হাতগুলো একেবারে কেটে ফেলে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এর সাথে একমত হওয়া যাচ্ছে না নিম্নোক্ত কারনে। প্রথমত আরবি শব্দ ‘আইদিয়াহুমা’ , ‘ইয়াদ’ বা দুই হাতের বহুবচন। এক হাতের আরবি ‘ইদ’। আমরা জানি প্রতিটি মানুষের এমনকি চোরের ও দুইটার বেশি হাত নেই। তাহলে আমরা তিন বা ততোধিক হাত কেমনে কাটব? যদি আমরা স্বীকার ও করে নেই যে এই আয়াতে পুরুষ ও নারী দুই চোরের কথা বলা হয়েছে , তাহলে কি আমাদের চোরের দুটো হাতই কেটে ফেলতে বলা হয়েছে?

দ্বিতীয়ত যদি কাউকে ভুলবশত চোর সাব্যস্ত করা হয় বা কাউকে শত্রুতাকরে চোর হিসাবে ফাসানো হয় অতঃপর তাদের দুই হাত কেটে ফেলা হয় , তখন কিভাবে শুধরানো হবে? আবার এমন ও তো হতে পারে , এমন কেউ যার হাত নেই কিন্ত বুদ্ধি দিয়ে চুরি করতে সহায়তা করেছে, তার কি শাস্তি?

তৃতীয়ত হাত কেটে ফেলা হলে , ৫:৩৯ আয়াতে আল্লাহ যে বলেছেন চোর যদি তওবা করে ও সংশোধিত হয় , তো আল্লাহ নিশ্চয় তার তওবা কবুল করেবেন। এই আয়াতের প্রোয়োগ কিভাবে হবে? হাত তো ফিরে আসবে না!! এর অর্থ দাড়ায় হাত সম্পুর্ন কেটে ফেল্লে ৫:৩৯ আয়াতের কোন কার্যকারীতাই থাকে না। কোরানের আয়াত তো আর মিথ্যা হতে পারে না!!

২য় মতানুযায়ী হাত একেবারে কেটে না ফেলে , হাতে cut mark বা দাগ চিহ্ন রেখে দিতে। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসাবে তারা কোরআনের ১২:৩১ ও ১২:৫০ আয়াতদ্বয়ের উল্লেখ করেন , যেখানে মহিলারা ছুরি দিয়ে নিজেই নিজের হাত কেটেছিল। নিজেই নিজের হাত নিশ্চয় সম্পুর্ন কেটে ফেলা সম্ভব না। কমনসেন্স তাই বলে।

১২:৩১ “…. সে তাদের প্রত্যেককে একটি ছুরি দিয়ে বললঃ ইউসুফ এদের সামনে চলে এস। যখন তারা তাকে দেখল, হতভম্ব হয়ে গেল এবং আপন হাত কেটে ফেলল। তারা বললঃ কখনই নয় এ ব্যক্তি মানব নয়। এ তো কোন মহান ফেরেশতা।”
১২:৫০ “বাদশাহ বললঃ ফিরে যাও তোমাদের প্রভুর কাছে এবং জিজ্ঞেস কর তাকে ঐ মহিলার স্বরূপ কি, যারা স্বীয় হস্ত কর্তন করেছিল! আমার পালনকর্তা তো তাদের ছলনা সবই জানেন।”

যদিও হাতে দাগ দেয়া মানবিক ও ব্যাবহারিকভাবে অধিক গ্রহনযোগ্য তবুও এই মতের সাথেও একমত হওয়া যাচ্ছে না। কারন ১ম মতের বিরুদ্ধে যে কারন গুলো উল্লেখ করা হয়েছে , তা এই মতের বিরুদ্ধেও খাটে। তাছাড়াও বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এতই উন্নতি হয়েছে যে প্লাস্টিক সার্জারী করে দাগ তুলে ফেলা কোন ব্যাপারই নয়।

তদুপরি ৫:৩৮ আয়াতে ‘কাতা’আ’ আর ১২:৩১ আয়াতে ‘কাত্তা’আ’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। যদিও দুটো শব্দই আরবিতে একই শব্দের ভিন্ন রুপ এবং ‘কাত্তা’আ’ শব্দের মানে কোরানের অন্য আয়াতগুলোতে (৫:৩৩, ৭:১২৪, ২০:৭১ ও ২৬:৪৯) সম্পুর্ন কেটে ফেলা বলা হয়েছে। তাহলে আমরা কোন মানেটা নিব? হাত সম্পুর্ন কেটে ফেলা নাকি হাতে কেটে দাগ বা চিহ্ন দিয়ে দেয়া? উত্তর কোরানের আলোকে পরের পোস্টে দিব ইনশাল্লাহ।

Sunday, March 6, 2011

আমাদের এই মহাবিশ্ব কোথা থেকে এসেছে? (১)

বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনের নাম শোনে নি , এমন বিজ্ঞানমনস্ক লোক আজকের বিশ্বে খুজে পাওয়া যাবে না। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে আইনস্টাইন ৩টি গবেষনাপত্র প্রকাশ করে সারা পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। এই গবেষনাপত্রের মাধ্যমে তিনি পরমানূর (atom) অস্তিত্ব প্রমান করেন , আপেক্ষিক তত্ব (theory of relativity) সকলের সামনে উপস্থাপন করেন এবং কুয়ান্টাম বলবিদ্যার (quantum mechanics) বর্ণনা করেন।

২৬ বছর বয়সী এক বৈজ্ঞানিকের জন্য শুরুটা মন্দ ছিল না!

তার আপেক্ষিকতার সমীকরন , আমাদের এই মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হচ্ছে , এমনটাই ইঙ্গিত করছিল। এটাকে তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কারন তাহলে স্বীকার করে নিতে হয় , এই মহাবিশ্বের শুরু আছে এবং কেউ একে শুরু করেছিল। যেহেতু এটা তার মনঃপুত হয় নি , সেকারনে তিনি আপেক্ষিকতার সমীকরনের মধ্যে একটি 'গোঁজামিল ফ্যাক্টর' ('fudge factor') ঢুকিয়ে দিলেন। যাতে করে "এই মহাবিশ্বের শুরু বা শেষ নেই , এটা প্রসারিত বা সঙ্কুচিত হচ্ছে না" এটা নিশ্চিত করা যায়।

কিন্তু ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল্‌ দেখালেন , বিগ ব্যাঙের মডেলের ভবিষ্যদবাণী অনুযায়ী কীভাবে সবচেয়ে দুরের গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দুরে আরো দুরে সরে যাচ্ছে। ১৯৩১ সালে আইনস্টাইন বিগ ব্যাঙ থিওরীকে মেনে নিয়ে বল্লেন ," সৃষ্টির যত ব্যাখ্যা আমি শুনেছি , এটাই তার মাঝে সবচেয়ে সুন্দর ও সন্তুষ্টিকর।" আর 'গোঁজামিল ফ্যাক্টর'কে তার কর্মময় জীবণের সবচেয়ে বড় ভুল বা ব্লান্ডার বলে স্বীকার করেছিলেন।

পরবর্তিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের পরীক্ষা ও মাপজোঁকে আইনস্টাইনের থিওরীগুলোর সত্যতা বারে বারে প্রমানিত হয়েছে। তবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্বের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ঠ হলো , বিগ ব্যাঙের মধ্য দিয়ে এই মহাবিশ্বের শুরুই শুধু হয় নি , সময় এবং কারন ও ঘটনার (cause and effect) যোগসুত্রের শুরুটাও একি সাথে শুরু হয়েছিল।

হ্যা , এটাই ঠিক। মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে কোন সময় ছিল না। সময় রেখার শুরুই হয় বিগব্যাঙের সাথে। সময় ও স্পেস বা মহাশুন্যের বাইরে থেকে এক বুদ্ধিমত্তা কতৃক বস্তু , শক্তি , সময় ও মহাশুন্য সৃষ্টি হয়েছিল।

এই বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আইনস্টাইন তার "বিশ্বকে আমি যেভাবে দেখি /The World As I See It" বইয়ে লিখেছেন যে , প্রাকৃতিক আইনগুলোর সুসামন্জস্যতা এক উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্বই প্রকাশ করে , যার তুলনায় সকল মানবের চিন্তা ও কাজ একেবারেই নগন্য।

তিনি আরো লিখেছেন , যারাই আন্তরিকতার সাথে বিজ্ঞান চর্চার সাথে জড়িত , তাদের কাছে মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রাকৃতিক আইনের ভিতরে একটি আত্মা /spirit সুস্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান হবে - যে আত্মা মানুষের থেকে বহু গুনে উন্নততর এবং যার সামনে আমাদের সীমিত ক্ষমতা একেবারেই তুচ্ছ।

খুবি তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য , নয় কি?

একটি নুতন বিবর্তনবাদ - ভিন্ন চিন্তা (২)

(প্রচলিত ধারনা বা জানার বাইরে কোন বক্তব্য আসলেই মোল্লারা যেমন গালাগালি করে থাকে বা বলে থাকে কোরান হাদীস পড়ে আসুন , তেমনটি মুক্তমনাদের কাছ থেকে ও গালাগালি বা বিবর্তনের অমূক বইটি পড়ে আসুন , এমন ধরনের বক্তব্য আকাঙ্খিত নয়।)

নুতন বিবর্তনবাদ -
"পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর লক্ষ্যে জীবের ডিএনএ'তে বিক্ষিপ্ত পরিব্যক্তি (random mutation) নয় বরং পরিকল্পিত বদল বা প্রতিকল্পন ঘটে থাকে।"
(There is a mutation algorithm in DNA that makes *intelligent*
substitutions when species need to adapt to their environment.)

গত পোস্টে একটি উদাহরন দিয়েছিলাম যেখানে -
"The quick brown fox jumped over the lazy dog"
সফল বিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছিল নিম্নের বাক্যে-
"The hot blonde fox sauntered past the sunbathing man."

এই সফল বাক্যটি পাওয়া গিয়েছিল পরিকল্পিত ভাবে বিশেষ্য ও ক্রিয়া বদলের মাধ্যমে , যা বিক্ষিপ্ত ভাবে বর্ণ বদলের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।

ডিএনএ'তে ও পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর লক্ষ্যে , একই ভাবে ব্যাকরণের নিয়ম মেনেই বিক্ষিপ্ত ভাবে কোন একটি নিওক্লেইক এসিডের পরিবর্তে পুরো একটি ডিএনএ অনুক্রমের (Transposon) পরিকল্পিত বদল ঘটে থাকে।

এটা নুতন কোন তথ্য ও নয় বা থিওরী ও নয়। এটাই ঘটনা ,ফ্যাক্ট।

এটা আসলে ৬০ বছরের ও বেশি পুরনো। যারা আগে শোনেন নি , তাদের কাছেই শুধু এটা নুতন ঘটনা।

জীববিজ্ঞানী বারবারা ম্যাকক্লিনটক ১৯৪৪ সালে এটা আবিস্কার করেন এবং এই আবিস্কারের জন্য ১৯৮৩ সালে নোবেল প্রাইজ পান। তার ছবি আমেরিকার ডাক টিকেটে ছাপা হয়েছে এবং তিনি ইতিহাসের এক অন্যতম জীববিজ্ঞানী হিসাবে স্বীকৃত।

তার এই আবিস্কার এতটাই র‌্যডিকেল ও ডারউইনের থিওরীর পরিপন্থী ছিল যে , বারবারা ম্যাকক্লিনটক তার এই আবিস্কার প্রচার না করে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তখনকার বৈজ্ঞানিক সমাজে একঘরে হওয়ার ভয়েই তিনি এমনটি করেছিলেন।

কেউ কেউ এমন প্রশ্ন করতে পারেন - জীববিজ্ঞানের ক্লাশে এগুলো পড়ানো হয় না কেন?

ভাল প্রশ্ন।

শুধু এটুকুই বলা যায় - জীববিজ্ঞানের ক্লাশে এগুলো পড়ানো হয় না , এর কারন এটা নয় যে এটার সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয় বা এমন ও নয় যে বিক্ষিপ্ত পরিব্যক্তির মডেল (random mutation) কাজ করে। আসলে বিক্ষিপ্ত পরিব্যক্তির মডেল (random mutation) কাজ করে না। এখনো এমন কোন সত্যিকারের গবেষনা বা পরীক্ষার কথা কেউ বল্তে পারবে না , যার মাধ্যমে দেখানো সম্ভব বিক্ষিপ্ত পরিব্যক্তি বিবর্তনকে চালনা করে।(কারো এমন কোন গবেষনার কথা জানা থাকলে , জানালে উপকৃত হব।) দুঃখের সাথে বল্তে হয় , বিক্ষিপ্ত পরিব্যক্তির থিওরী একটি শহুরে লৌকিক উপাখ্যান (যার সত্যতা নিরূপন দুরূহ) ছাড়া আর কিছু নয়।

মজার কিছু তথ্য -

পরিকল্পিত বিবর্তন যে উপায়ে ঘটে , ঠিক সেই উপায়েই আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system) সম্পুর্ণ নুতন জীবাণুর (যার সাথে আগে কখনো মোলাকাত হয় নি) সাথে যুদ্ধের অস্ত্র (এন্টিবডি) তৈরির জ্ঞান অর্জন করে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন সংযুক্তির (combination) মাধ্যমে চেষ্টা করে আক্রমনকারী জীবাণুর কোড ভাঙ্গতে। যখনই এই কোড ভাঙ্গা সম্ভব হয় , তখন পরবর্তি প্রজন্মের কোষে (daughter cells.) ডিএনএ'র নুতন পুনর্বিন্যাসের তথ্য সরবরাহ করা হয়।

আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের একটি ক্ষুদ্রাকার প্রতিরূপ বা মডেল।

চিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ জেমস্‌ শাপিরোর একটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ আবিস্কারের কথা উল্লেখ না করলেই নয় -
"প্রোটোজোয়া পরিবেশের চাপে পড়লে নিজের ডিএনএ'কে কেটে প্রায় ১লক্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরো করে ফেলে। অতঃপর পরিবেশের শত শত পরিবর্তনীয়কে (variables) ধর্তব্যে এনে ডিএনএ'কে এমনভাবে পুনঃসংযোজন করে , যাতে একটি নুতন আরো ভাল ও সক্ষম প্রোটোজোয়ায় বিবর্তিত বা বিকশিত হয়।"

ভাল করে আর একবার পড়ে এর গুরুত্ব অনুধাবনের চেষ্টা করুন। প্রটোজোয়া নিজের ডিএনএ'কে নিজেই রিপ্রোগ্রাম করে বিবর্তিত হয়। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাক্টেরিয়ার উদ্ভব ও একি প্রকৃয়ায় ঘটে থাকে। আমাদেরকে ব্যাক্টেরিয়ার জনপুন্জে সুদুর ভবিষ্যত পর্যন্ত যত এন্টিবায়োটিক আবিস্কার হবে , তার প্রত্যেকটির একটি/কয়েকটি করে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থীতি আগে থেকেই বিদ্যমান , এমন উদ্ভট দাবীতে আর বিশ্বাস না রাখলেও চলবে।